বুনো আলু আর কচু খেয়েই খিদে মিটছে ওঁদের !

অসহনীয় দারিদ্র আর অপুষ্টির সঙ্গে সারা বছর জুড়েই এঁদের বাস। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে অর্ধাহারে, কখনও অনাহারেই কাটছে ওঁদের।

সারা বছর কোনওরকমে একবেলা ভাতের জোগাড় হয়ে যেত কখনও মাটি কেটে, কখনও কারও বাড়িতে বাঁশের বেড়া তৈরি করে। লকডাউনে এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ। কিন্তু পেট তো মানে না! তাই আশপাশের জঙ্গল থেকে খুঁজে আনা বুনো আলু এবং কচু সেদ্ধ করে খেয়ে কোনওমতে টিকে আছেন ওঁরা।

আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের টটপাড়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় থাকেন ১৫টি পরিবারের ৫৫ জন আদিবাসী। এর মধ্যে ২০টি শিশু। তাদেরও মুখেও তুলে দিতে হচ্ছে বুনো কচু-আলু সেদ্ধ। এখন পর্যন্ত কোনও সাহায্য পাননি ওই অসহায় আদিবাসী দরিদ্র মানুষগুলি।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এলাকার প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য অসীম সরকারের কাছে গিয়েছিলেন তাঁরা। অসীম তাঁদের নামের তালিকা তৈরি করে আলিপুরদুয়ার বিধানসভা এলাকার টটপাড়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের কাছে জমা দিয়েছেন বলে জানান।

লক্ষ্মীরাম মুর্মু, রমেশ মারাণ্ডি, মঙ্গল হেমব্রমরা জানালেন, তাঁদের কারও নিজস্ব ঘর নেই। আসলে তাঁরা সবাই নমনি অসমের বাসিন্দা। অসমে গোষ্ঠী সংঘর্ষের শিকার হয়ে ১৫ বছর আগে ভিটেমাটি ছেড়ে টটপাড়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এসে আশ্রয় নেন। প্রথমে রেল স্টেশনের পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁরা। রেল কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে পরে তাঁরা মজিখানা,

টটপাড়া, হাড়িভাঙ্গা-সহ চার-পাঁচটি গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে আশ্র‍য় নেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের জমিতে ত্রিপল টাঙিয়ে অথবা কারও পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকেন ওঁরা। গত ১৫ বছর ধরে এভাবেই স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয়ে বসবাস করছেন। ওঁদের সকলেরই জীবিকা দিনমজুরি।

মূলত মাটি কাটা, জ্বালানির কাঠ কাটা, বাঁশের বেড়া দেওয়া অথবা মাটির ঘর তৈরি করার কাজ করেন এঁরা। লকডাউনের পর কেউই কাজ পাচ্ছেন না। ওঁরা যে দেশের নাগরিক সেই প্রমাণও ওঁদের কাছে নেই। প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য অসীম জানালেন, ওঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করলেও ওঁদের কারও রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড কিছুই নেই।

এলাকার ভোটারও নন তাঁরা। তাই সরকারি কোনও সুবিধা পাচ্ছেন না ওঁরা। এর ফলে করুণ অবস্থার মধ্যে দিন কাটছে ১৫টি আদিবাসী পরিবারের। তিনি বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন লকডাউনে রাজ্যের কোনও মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকেন। এর পরেও এঁরা আলু-কচু সেদ্ধ খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, সেটা খুবই দুঃখজনক।’’

স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ ভট্টের তাঁর পুরনো বাড়িতে তিনটে আদিবাসী পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন। একই ভাবে দীপক মজুমদারের বাড়িতে রয়েছে একটি পরিবার। গণেশ বলেন, ‘‘আমার বাড়িটা পড়েই রয়েছে। ওঁদের থাকতে দিয়েছি। ওঁরাই বাড়িটা দেখেশুনে রাখেন। ওঁদের অসহায় অবস্থার কথা শুনে খুব খারাপ লাগল।

সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করব।’’ হাড়িভাঙ্গা গ্রামে কাজল দেবনাথের জমিতে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে ঘর তুলে থাকেন লক্ষ্মীরাম মারাণ্ডি ও তাঁর স্ত্রী ফুলিন টুডু। তাঁদের দুই ছেলে। তাঁরা জানালেন, অসমে তাঁদের ঘরবাড়ি চাষের জমি, বাঁশবাগান ছিল।

সব ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে এখানে এসে অন্যের আশ্রয়ে দিনমজুরি করে কোনও মতে দিন কাটাচ্ছিলেন। লকডাউন তাঁদের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে বলে তাঁদের হতাশ মন্তব্য। বললেন, এভাবে অর্ধাহারে অনাহারে বুনো আলু ও কচু খেয়ে তাঁরা বাচ্চাদের নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে পারবেন জানেন না।

টটপড়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান প্রিয়াঙ্কা দাস বলেন, ‘‘অসম থেকে আসা ওই আদিবাসী পরিবারগুলির কথা প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য অসীম সরকারের থেকে জেনেছি। ওঁদের পাশে আছি। ওঁদের হাতে দ্রুত ত্রাণ দেব। ওঁদের ভোটার, আধার ও রেশন কার্ড না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। তবু ওঁদের সাহায্যে উদ্যোগী হব।’’

আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের সভাধিপতি শীলা দাস সরকার শনিবার বলেন, ‘‘এই জেলায় কেউ অভুক্ত নেই। যাঁদের ঘরে খাবার নেই, তাঁদের ঘরে আমরা খাবার পৌছে দিচ্ছি। তাঁরা যে রাজ্যেরই বাসিন্দা হোক। তাঁদের খাবারের কোনও সমস্যা থাকবে না।

২৩ ঘণ্টা রোজা রাখেন যে দেশের মু’সলমানরা!

ধৈর্য ও সহিঞ্চুতার বারতা নিয়ে রমজান আসে। পানাহার ও যৌ’নাচার বর্জনের এইপরীক্ষায় সবার ক’ষ্ট এক রকম হয় না। কোনো কোনো দেশের মানুষ ১০ ঘন্টারও কমরোজা রাখেন, আবার কোনো কোনো দেশের রোজাদারেরা রোজা রাখেন দীর্ঘ ২৩ ঘন্টা!

যু’ক্তরাজ্য, রাশিয়া, ডেনমা’র্ক, বেলারুশ, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড,কাজাকিস্তান, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিক, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিতে রোজা রাখার সময় প্রায় ১৯ ঘণ্টা।আবার মাত্র ৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট রোজা রাখছেন আর্জেন্টিনার মু’সলিম বাসিন্দারা।

এছাড়াও ১০ ঘণ্টা রোজা রাখছেন অস্ট্রেলিয়ার মু’সলিম’রা। ১১ঘণ্টার কাঁ’টায়ও রয়েছেসবচেয়ে কম সময় উপবাস থেকে রোজা রাখছেন আর্জেন্টিনার পার্শ্ববর্তী দেশ ব্রাজিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ৯-২১ ঘণ্টার মাঝামাঝিতেও পানাহার বর্জনের পরীক্ষা দেনঅনেকেই। সে দেশগুলো হলো- মধ্যপ্রাচ্যের মিশরে প্রায় ১৬ ঘণ্টা, সৌদি আরব, সংযু’ক্তআরব আমিরাত, ফিলি’স্তিন ও ইয়েমেনে ১৫ ঘণ্টা, কাতার ১৪ ঘণ্টা ৪০ মিনিট এবং

কুয়েত, ই’রাক, জর্দান, আলজেরিয়া, ম’রক্কো, লিবিয়া ও সুদানে ১৪ ঘণ্টা। পাশাপাশিএশিয়ার পা’কিস্তানে প্রায় ১৫ ঘণ্টা ও ভা’রতীয় মু’সলমানরা ১৪ ঘণ্টা ১৬ মিনিট রোজা রেখে উপবাস থাকেন।এছাড়াও ফ্রান্সে ১৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট, ইতালিতে ১৭ ঘণ্টা, কানাডায় পৌনে ১৫ ঘণ্টা,

ফিলিপাইনসে সোয়া ১৪ ঘণ্টা, মালয়েশিয়ায় ১৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, সিঙ্গাপুর ১৩ ঘণ্টা ৩মিনিট এবং কেনিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সোয়া ১৩ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয়।এর মধ্যে বেশ দীর্ঘ সময় রোজা রাখছেন পৃথিবীর উত্তরাঞ্চলের মু’সলমানরা। বিশেষত

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর (১. আইসল্যান্ড ২. সুইডেন ৩. নরওয়ে ৪. ডেনমা’র্ক ৫. ফিনল্যান্ড) অধিবাসীরা।

তাদের রোজার দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ ঘন্টা। আবার আইসল্যান্ড ও গ্রীনল্যান্ডে বসবাসরত মু’সলমানদের রোজার সময়ের দৈর্ঘ্য গড়ে ২১ ঘণ্টা।ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এর নর্ডিক অঞ্চলের একটি দেশ ফিনল্যান্ড।

জীবনযাত্রার মান যথেষ্ট উন্নত হওয়ায় নানা দিক থেকে বিশ্বের মানুষের মাঝে আজ বেশআ’লোচিত একটি দেশ এটি। শীতপ্রধান এ দেশটির মোট জনসংখ্যা পঞ্চাশ লাখেরমতো। এর মধ্যে মু’সলমানের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ মু’সলমান।

ফিনল্যান্ডের মু’সলমানরা এবারের রোজায় ২২ ঘণ্টারও অধিক সময় রোজা রাখছেন।রাজধানী হেলসিংকি সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত হওয়ার কারণে এখানে বসবাসরতরোজাদাররা রোজা রাখেন ২২ ঘণ্টা ১২ মিনিট। এটিই হলো- ফিনল্যান্ডের রোজার

সবচেয়ে কম সময়। অন্যান্য এলাকায় রোজার সময় আরও বেশি।

ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে উত্তরের শহর ল্যাপল্যান্ড এলাকায় বসবাসরত মু’সলামানরাসবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রোজা রাখেন। সেখানে রাত আসে মাত্র ৫৫ মিনিটের জন্য।তাদের প্রতিদিনকার রোজার দৈর্ঘ্য হয় ২৩ ঘণ্টারও বেশি।

রমজানরাজধানী থেকে উত্তর দিকের শহরগুলোতে রোজার সময় বেড়ে যায়। ফিনল্যান্ডেরউত্তরদিকের বৃহত্তম শহর উলু। সেখানকার রেজাদারগণ ২৩ ঘণ্টা (৭ মিনিট কম) রোজা

রাখেন। দেশের উত্তরের অন্যান্য শহরগুলোতে ১ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে ইফতার ও সাহরি সম্পন্ন করতে হয় রোজাদারদের।এতো দীর্ঘ সময় রোজা রাখা অনেকটা অসাধ্য হওয়ায় সেখানকার ইস’লামিক স্কলাররা

ফাতাওয়া দিয়েছেন পার্শবর্তী কোনো মু’সলিম দেশের সময় অনুপাতে রোজা রাখতে।কিন্তু ফিনল্যান্ডের অধিবাসীরা এই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২৩ ঘন্টা রোজা রাখছেন। আর ইফতার করছেন মাত্র ১ ঘন্টার জন্য।

ফিনল্যান্ডে বসবাস করেন নানা দেশীয় মু’সলমান। ই’রাক, সোমালিয়া, তুরস্ক,থাইল্যান্ডের অনেক মু’সলমান এখানে বসবাস করেন।

তাতারিদের মাধ্যমে দেশটিতে ইস’লাম প্রবেশ করলেও নব্বইয়ের দশকের শুরুতেশরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মু’সলমানদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে ফিনল্যান্ডে।

এক সময় ফিনল্যান্ডে সবধরনের ইস’লামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। ১৯২৫ সালে সর্বপ্রথমআনুষ্ঠানিকভাবে ইস’লামী জলসা অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপেরদেশগুলোর মাঝে ফিনল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম কোনো ইস’লামি জলসার অনুমোদন দেয়।

দীর্ঘতম দিনের বিষয়টি মা’থায় রেখে ফিনল্যান্ডের মু’সলমানরা তাদের পার্শ্ববর্তী দেশেরসময় অনুযায়ী রোজা পালন করেন। ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় রোজার দৈর্ঘ্য হলেফিনল্যান্ডের অধিকাংশ মু’সলমান পার্শ্ববর্তী দেশের সময়ের সঙ্গে মিল করে রোজা রাখেন।

ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ডে বসবাসরত মু’সলমানরা তাদের রোজার সময় নির্ধারণ করেনসবচেয়ে কাছের মু’সলিম দেশ তুরস্কের সময় অনুযায়ী। গতবছর এক ফতোয়ায়তাদেরকে ম’ক্কা অথবা নিকটতম মু’সলিম দেশের রোজার সময় অনুসরণ করতে বলা

হয়েছে। এ বছর তাদের অনেকেই সেই ফতোয়াকে অনুসরণ করছেন। -‘আল মিসরি আল ইয়াউম’ ও ‘কল্লা ওয়া দাল্লা’ ওয়েস অবলম্বনে

Related posts

Leave a Comment